November 27, 2020, 12:08 am

শিরোনাম
৪৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা করলো ফেসবুক পিরোজপুর পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডবাসীর সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চায় মোঃ শাহজালাল শেখ। ভি বি ডি পিরোজপুর জেলা শাখার উদ্যোগে রান্না করা খাবার বিতরণ। বঙ্গবন্ধু টি ২০ কাপে থিম সং নিয়ে শাহারিয়ার রাফাত, আয়েশা, ও প্রতীক হাসান সংস্কার হওয়া শ্রমিক আইনে ৮ শর্তে সৌদি প্রবাসীরা কফিলের অনুমতি ছাড়াই চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন! নির্বাচন নিয়ে আমাদের থেকে আমেরিকার অনেক কিছু শেখার আছে: সিইসি নুরুল হুদা আলোচিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমকে বদলি পুলিশের সিনিয়র এএসপিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ জুম্মনের আইনজীবী সনদ বৈধ, ব্যারিস্টার সুমন-ইশরাতের জরিমানা ! বাগেরহাট জেলায় কৃষি বিভাগের সেবা নিয়ে সেবাদাতা ও গ্রহীতাদের মুখোমুখি সভা।

জাতীয় চার নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারারুদ্ধ থাকাকালে বা তার অবর্তমানে জাতীয় চার নেতা- সর্বজনশ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান- বারবার জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয়, সমগ্র বিশ্বে যে কারাগারকে মনে করা হয় সবচেয়ে নিরাপদ স্থান, সেই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এবার করোনা মহামারীর কারণে ‘জেলহত্যা দিবস’ সীমিত পরিসরে পালন করতে হচ্ছে। জেলহত্যা দিবসের বেদনাভারাক্রান্ত দিনে জাতীয় চার নেতার সংগ্রামী জীবনের প্রতি নিবেদন করছি বিনম্র শ্রদ্ধা।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়; তারপর থেকে জাতীয় চার নেতা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দলমতনির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার পরিচালনা করেন এবং বিজয়ের লাল সূর্যটি ছিনিয়ে আনেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপরই ২৯ মার্চ রওনা করে তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম আমাদের আগেই সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং ১ এপ্রিল ভারতে পৌঁছান। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা দিল্লি গমন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করে বাস্তবোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

এখানে উল্লেখ্য, ’৬৯-এর অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু লন্ডন যান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শ্রী ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জির- মিস্টার নাথ- সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ’৭১-এর শুরুতেই বঙ্গবন্ধু ঠিক করে রেখেছিলেন আমরা কোথায় গেলে সাহায্য পাব। ১৮ ফেব্রুয়ারি আমাদের চারজনকে- শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও আমাকে- বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠালেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে। সেখানে জাতীয় চার নেতাও ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেন, ‘পড়ো, মুখস্থ করো।’ আমরা মুখস্থ করলাম একটি ঠিকানা, ‘সানি ভিলা, ২১, রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এখানেই হবে তোমাদের জায়গা। ভুট্টো-ইয়াহিয়া ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ক্ষমতা দেবে না। আমি নিশ্চিত ওরা আক্রমণ করবে। আক্রান্ত হলে এটাই হবে তোমাদের ঠিকানা। এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করবে।’ জাতীয় পরিষদ সদস্য চিত্তরঞ্জন সুতারকে তিনি আগেই কলকাতায় প্রেরণ করেছিলেন।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডাক্তার আবু হেনাকে কলকাতা পাঠিয়েছিলেন। সেই পথেই ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান সাহেব, মণি ভাই এবং আমাকে আবু হেনা সাহেব নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা ৪ এপ্রিল কলকাতা পৌঁছে রাজেন্দ্র রোডের সানি ভিলায় অবস্থান করি। আর ৮নং থিয়েটার রোডে অবস্থান করতেন জাতীয় চার নেতা। কলকাতায় মুজিব বাহিনীর হেডকোয়ার্টারে থাকার সুবাদে নেতাদের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হতো।

জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে ’৭১-এর ১০ এপ্রিল অস্থায়ী রাজধানী মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং উপরাষ্ট্রপতি তথা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন তাজউদ্দীন আহমদ। ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র ও পুনর্বাসনবিষয়ক মন্ত্রী হন। ১৭ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন।

সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ দূরদর্শিতার সঙ্গে সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সবার সঙ্গে পরামর্শ করে ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আমরা চারজন মুজিব বাহিনীর অধিনায়ক ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বর্ডারে বর্ডারে ঘুরেছি, রণাঙ্গনে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গিয়েছি, একসঙ্গে কাজ করেছি। আমার ক্যাম্প ছিল ব্যারাকপুর, মণি ভাইয়ের আগরতলা, সিরাজ ভাইয়ের শিলিগুড়ি, আর রাজ্জাক ভাইয়ের মেঘালয়।

এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। মেজর জেনারেল উবানের নেতৃত্বে দেরাদুনে ছিল আমাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দুর্গাপ্রসাদ ধর তথা ডিপি ধর আমাদের কাজের সমন্বয় করতেন। এছাড়াও সমন্বয়ক হিসেবে ছিলেন মেজর জেনারেল সরকার। এ দুজনসহ শ্রীফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি তথা মিস্টার নাথ- এ তিনজন আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে মুজিব বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণ করাতাম এই বলে যে, ‘প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিব তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ আমরা জানি না।

কিন্তু যতক্ষণ তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে আমরা হানাদারমুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমরা মেঝেতে শয্যা পেতেছি। নিজেদের মধ্যে খাবার ভাগাভাগি করে খেয়েছি। পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছি। জাতীয় চার নেতা নিজেদের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করেছেন। তাজউদ্দীন ভাই নিজের কাপড় নিজে ধুতেন। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। জাতীয় নেতাদের সেসব ত্যাগ-তিতিক্ষা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ’৭১-এর ১৮ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে আমি এবং রাজ্জাক ভাই বিজয়ীর বেশে প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করি। ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার ফিরে এলে জাতীয় চার নেতাকে আমরা বীরোচিত সংবর্ধনা জানাই।

আর ৯ মাস ১৪ দিন কারারুদ্ধ থাকার পর পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে বিজয়ের পরিপূর্ণতায় জাতির পিতা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি। পরদিন ১১ জানুয়ারি তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনা বিষয়ে সব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাবেন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং; সৈয়দ নজরুল ইসলাম শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী; তাজউদ্দীন আহমদ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী; ক্যাপ্টেন মনসুর আলী যোগাযোগমন্ত্রী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান সাহেব ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হওয়ার। সেই থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে থেকেছি শেষদিন পর্যন্ত।

ছাত্রজীবন থেকে জাতীয় চার নেতাকে নিবিড়ভাবে দেখেছি। তাদের আদর-স্নেহ পেয়েছি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট যেদিন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, আমরা সেদিন নিঃস্ব হয়েছি। যার জন্ম না হলে এ দেশ স্বাধীন হতো না, তাকে বাংলার মাটিতে এভাবে জীবন দিতে হবে এটি কেউ কখনও ভাবেনি। খুনিরা চেয়েছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ যেন কোনোদিন রাষ্ট্রপরিচালনায় না আসতে পারে।

সেজন্য তারা শিশু রাসেলকে প্রাণভিক্ষা দেয়নি। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী চক্র দেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে প্রথমে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে এবং পরে জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তখন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বিদেশে অবস্থান করছিলেন। দেশে থাকলে তাদেরও হত্যা করা হতো। ’৮১-এর ১৭ মে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দেশে ফিরে রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে প্রায় ৪০ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এই কালপর্বে খুনিচক্র থেমে থাকেনি। তাকে সর্বমোট ২১ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় চার নেতাসহ আমরা ছিলাম গৃহবন্দি। খুনিচক্রের হোতা মোশতাক জাতীয় নেতা মনসুর আলীকে বঙ্গভবনে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। ১৫ আগস্টের পরদিন খুনিরা আমার বাসভবন থেকে আমাকে তুলে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে অকথ্য নির্যাতন করা হয়।

২৩ আগস্ট পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি ই এ চৌধুরীর মাধ্যমে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধেয় নেতা জিল্লুর রহমান এবং আমাকে বঙ্গভবনে নিয়ে যায়। সেখানে খুনি মোশতাক আমাদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে নানারকম প্রস্তাব দিলে আমরা খুনির সেসব প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। ২২ আগস্ট জাতীয় চার নেতাসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে গ্রেফতার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাইন দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছিল হত্যা করার জন্য। ঘাতকের দল শেষ পর্যন্ত হত্যা করেনি। পরে নেতাদের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

গৃহবন্দি অবস্থা থেকে একই দিনে আমাকে, জিল্লুর রহমান ও আবদুর রাজ্জাককে গ্রেফতার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ছয়দিন বন্দি রেখে আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে খুনিচক্র আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে চোখ ও হাত-পা চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে। পরে অর্ধমৃত অবস্থায় পুলিশ কন্ট্রোলরুমে রেখে আসে।

সিটি এসপি আবদুস সালাম ডাক্তার এনে আমার চিকিৎসা করান। পরে জিল্লুর রহমান ও প্রিয় নেতা রাজ্জাক ভাইকে কুমিল্লা কারাগারে আর আমাকে ও আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। যেদিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, সেদিন আমি ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে- ফাঁসির আসামিকে যেখানে রাখা হয়- বন্দি। তখন আমাদের দুঃসহ জীবন!

সহকারাবন্দি ছিলেন ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার এডিটর আবিদুর রহমান- যিনি ইতোমধ্যে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। ময়মনসিংহ কারাগারের জেল সুপার ছিলেন শ্রী নির্মলেন্দু রায়। কারাগারে আমরা যারা বন্দি তাদের প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। বঙ্গবন্ধু যখন বারবার কারাগারে বন্দি ছিলেন, নির্মলেন্দু রায় তখন কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন। বঙ্গবন্ধু তাকে খুব স্নেহ করতেন।

সেদিন গভীর রাতে নির্মলেন্দু রায় আমার সেলে এসে বলেন, ‘ঢাকা কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা কারাগারের চতুর্দিক পুলিশ দ্বারা বেষ্টন করে রেখেছি, জেল পুলিশ ঘিরে রেখেছে। এসপি সাহেব এসেছেন আপনাকে নিয়ে যেতে।’ এসপি এমআর ফারুক আমাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন; আমি বলেছিলাম, এভাবে তো যাওয়ার নিয়ম নেই। আমি এখান থেকে যাব না। জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের দুঃসংবাদটি শুনে মন বেদনাভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় চার নেতার জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে কত অবদান! বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেয়ার পর মার্চের ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখ হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক, সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথম সহসভাপতি, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অন্যতম সহসভাপতি এবং এএইচএম কামরুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আমরা ’৬৬-এর ৭ জুন হরতাল পালন করি।

হরতাল পালন শেষে এক বিশাল জনসভায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছয় দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে সুন্দর বক্তৃতা করেন। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। তাজউদ্দীন আহমদ দক্ষ সংগঠক। কামরুজ্জামান সাহেব এমএনএ হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলে ধরতেন।

আটষট্টিতে কারাগারে থাকা অবস্থায় তাজউদ্দীন ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচিত হন। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ’৬৯-এর গণআন্দোলনের সময় দলের শীর্ষ নেতারা কারাগারে বন্দি ছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম তখন দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।

জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মরহুম আহমেদুল কবীরের বাসভবনে উবসড়পৎধঃরপ অপঃরড়হ ঈড়সসরঃঃবব সংক্ষেপে উঅঈ-এর সভা চলছিল। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আমি যখন ১১ দফা কর্মসূচি ব্যাখ্যা করছি, তখন ন্যাপ নেতা মাহমুদুল হক কাসুরি ১১ দফা কর্মসূচি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তোমরা ১১ দফা কর্মসূচিতে শেখ মুজিবের ছয় দফা হুবহু যুক্ত করেছ। সুতরাং তোমাদের ১১ দফা সমর্থনে প্রশ্ন আসবে।’ তার এ বক্তব্যের পর বলেছিলাম, আমরা বাঙালিরা কীভাবে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয় তা জানি।

আপনারা সমর্থন না করলেও এই ১১ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে মুক্ত করব। এ কথার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমায় বুকে টেনে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ তোমাদের পাশে থাকবে।’ ’৭০-এর নির্বাচনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং কামরুজ্জামান সাহেব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

আমিও মাত্র ২৭ বছর বয়সে এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে কে কোন পদে পদায়িত হবেন বঙ্গবন্ধু তা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। ’৭১-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধু নিজে জাতীয় পরিষদ নেতা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপনেতা, তাজউদ্দীন আহমদ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা এবং কামরুজ্জামান সাহেব সচিব; চিফ হুইপ পদে ইউসুফ আলী এবং হুইপ পদে যথাক্রমে আবদুল মান্নান এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম নির্বাচিত হন।

আর প্রাদেশিক পরিষদে নেতা নির্বাচিত হন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে মনসুর আলী হবেন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। এজন্য মনসুর আলী সাহেবকে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর সেটআপ করা ছিল। কিন্তু ’৭১-এর ১ মার্চ পূর্বঘোষিত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক একতরফাভাবে স্থগিত হলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় সর্বব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন। সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা ঘোষণার পর অসহযোগ সর্বাত্মক রূপ লাভ করে। বিশ্বে এমন অসহযোগ কখনও দেখেনি কেউ! বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড অসহযোগের প্রতিটি দিন সুচারুরূপে পরিচালনা করেছেন।

বছর ঘুরে যখন ‘জেলহত্যা দিবস’ ফিরে আসে, তখন আমার জীবনের কিছু ঘটনা আমাকে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। ’৭৫-এর ১১ জুলাই আমার বড় ভাইয়ের মৃত্যু হয়। ১৫ আগস্টের পর আমি তখন ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি। একদিন হঠাৎ আমার পরিবার- আমার স্ত্রী ও ৭ বছর বয়সী মেয়ে তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে- সাক্ষাৎ করতে আসে।

ওইদিন খবর পাই, আমাদের বাড়ির কাছে যে বাজার আছে, সেই বাজারে আমার সেজো ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদ- সম্প্রতি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে- সে ভোলায় গিয়ে তাকে হত্যা করার ব্যবস্থা করেছিল। আমার মা তখন জীবিত। তিন ছেলের একজন জেলে, আর দু’ছেলে বেঁচে নেই।

মায়ের সেই করুণ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, আবেগাপ্লুত হই- খুব খারাপ লাগে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাকে ৭ বার কারানির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। আমার বৃদ্ধা মা আমাকে একনজর দেখতে ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, সিলেট, কুমিল্লা, রাজশাহী, বরিশাল কারাগারে গিয়েছেন। আমার মাথায় হাত রেখে মুখের দিকে তাকিয়ে দোয়া করেছেন আর নীরবে চোখের পানি ফেলেছেন।

কী কষ্ট করেই না মা কারাগারে আমাকে দেখতে যেতেন। কারারুদ্ধ থাকাকালে অপরিসীম কষ্ট করেছেন আমার স্ত্রী। আমার স্ত্রীর নামে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চায়নি। যখনই শুনেছে তোফায়েল আহমেদের স্ত্রী, তখনই বলেছে, ‘না, বাড়ি ভাড়া দেয়া সম্ভব হবে না।’ কলাবাগানে আমার ভাগনি জামাইয়ের নামে গোপনে বাড়ি ভাড়া করে আমার স্ত্রী সেখানে দেড় বছর কাটিয়েছেন।

আমরা যারা কারাগারে বন্দিজীবন কাটিয়েছি, আমাদের চেয়েও কষ্ট করেছেন পরিবারের স্বজনরা। যারা কারাবন্দি থাকেন তাদের পরিবার-পরিজন যে কী কঠিন কষ্টে দিনাতিপাত করেন, তা বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ দুটোর পাতায় পাতায় আবেগমথিত ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে। আমার ছোট্ট মেয়েটি যখন জেলখানায় আমাকে দেখতে যেত, তখন সে বারবার জিজ্ঞেস করত, ‘আব্বু তুমি কবে বাড়ি যাবে।’ সে আমার সঙ্গে থাকতে চাইত।

কারণ সে তো বুঝত না। আমি তার উত্তর দিতে পারতাম না। আমাকে কখনও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়নি। ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, কাশিমপুর আবার কুষ্টিয়া কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। বন্দিজীবনে অনেক কষ্ট করেছি। তবুও বেঁচে আছি। কিন্তু যারা বেঁচে থাকলে জাতি উপকৃত হতো, সেই জাতীয় নেতাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়েছে।

ইতিহাসের মহামানব জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার নেতৃত্বে যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল, একটি স্বাধীনতা, আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। স্বপ্নের বাংলাদেশকে তিনি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে পরিণত করতে চেয়েছিলেন।

আমার দৃঢ়বিশ্বাস- জেলহত্যা দিবসের শোককে শক্তিতে পরিণত করে জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার আরাধ্য স্বপ্ন বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অচিরেই আমরা দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করব।

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ

শেয়ার করুন

© All rights reserved, প্রবাসী ক্লাব ফাউন্ডেশন- The Expat Club Foundation. (এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি)।  
Design & Developed By NCB IT
Shares